বৈশ্বিক কর্মী ছাঁটাইয়ে এআই নয়, দায়ী অর্থনৈতিক ধীরগতি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও চাকরির বাজারে বর্তমান ধীরগতির জন্য প্রযুক্তিটিকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন লিংকডইনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।

তার মতে, নিয়োগ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ অর্থনীতির দুর্বল অবস্থা ও উচ্চ সুদহার। খবর দ্য ন্যাশনাল।

লন্ডন টেক উইকে আয়োজিত এক আলোচনায় সম্প্রতি এ কথা বলেন পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনের প্রধান বৈশ্বিক বিষয়ক ও আইন কর্মকর্তা ব্লেক লউইট।

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে বর্তমানে নিয়োগের গতি আগের তুলনায় অনেক কম। তবে এর পেছনে এআই নয়, বরং কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা বেশি প্রভাব ফেলছে।’

লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, মহামারীর পর থেকে যুক্তরাজ্যে নিয়োগের হার প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। এছাড়া বছরভিত্তিক হিসাবেও নিয়োগ প্রায় ১০ শতাংশ করে কমছে। চাকরির বাজারে ধীরগতির পেছনে ২০২২ সালের পর সুদহার বৃদ্ধি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ব্লেক লউইট বলেন, ‘বর্তমানে চাকরির বাজারে নিয়োগের গতি অনেক কম। তবে লিংকডইনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর সঙ্গে এআইয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, যেসব খাত এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার কথা, সেসব ক্ষেত্রেও নিয়োগের হার অন্য খাতগুলোর তুলনায় বেশি কমেনি।’

তার ভাষ্য, বিপণন, গ্রাহকসেবা কিংবা প্রশাসনিক কাজের মতো পেশাগুলোকে অনেকেই এআইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। এসব খাতে নিয়োগ কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু তা সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যান্য খাতের তুলনায় বেশি নয়।

লিংকডইনের তথ্য আরো বলছে, চাকরি পরিবর্তনের হারও বর্তমানে ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অনেক কর্মী আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।

ব্লেক লউইটের মতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তারা নতুন কর্মী নেয়ার বিষয়ে রক্ষণশীল মনোভাব দেখাচ্ছে। এতে চাকরির বাজারে স্বাভাবিক গতি কমে গেছে।

গত কয়েক বছর প্রযুক্তি খাতের অনেক প্রধান নির্বাহী এআইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথা বলছেন। তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং গত মাসে জানান, অনেক প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তি চালুর আগেই কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছিল। পরে তারা সে সিদ্ধান্তকে এআইয়ের ওপর চাপিয়ে নিজেদের অবস্থানকে যৌক্তিক দেখানোর চেষ্টা করেছে।

একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মিনুশ শফিক। তিনি বলেন, ‘এআইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারাচ্ছে বলে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’

মিনুশ শফিক বলেন, ‘সম্ভাব্য চাকরি হারানোর ঝুঁকি মোকাবেলায় শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। এতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া সহজ হবে।

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে চাকরি হারিয়েছেন এক লাখের বেশি কর্মী। গুগল, অ্যামাজন ও টিসিএসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। জনবল কমানোর পেছনে মূল কারণ হিসেবে এআই-চালিত ভবিষ্যতের দিকে রূপান্তরের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্যাম অল্টম্যানের মতে, এসব চাকরি হারানোর পেছনে কেবল এআই দায়ী নয়।

অল্টম্যান বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে প্রকৃত কারণ গোপন করে এআইকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।’ যদিও এ সিইও সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেননি।’

স্যাম অল্টম্যান জানান, অনেক কর্মসংস্থান প্রকৃতপক্ষে সরাসরি এআইয়ের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পেশায় এ প্রযুক্তির কারণে প্রকৃত অর্থেই কিছু কর্মী স্থানচ্যুতির ঘটনা ঘটছে।

একাধিক বিশেষজ্ঞও স্যাম অল্টম্যানের এ দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৫৫ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পেছনে সরাসরি এআইয়ের প্রভাব ছিল। সংখ্যাটি শুনতে বিশাল মনে হলেও ওই বছর হওয়া মোট কর্মী ছাঁটাইয়ের তুলনায় এটি ১ শতাংশেরও কম।

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অ্যাকাউন্টিং বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক কেলভিন লর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের কারণে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর দাবির পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জনবল কমানোর প্রকৃত কারণ আড়াল করতেই এআইয়ের অজুহাত দিচ্ছে কোম্পানিগুলো।

অধ্যাপক কেলভিন বিষয়টিকে ‘এআই-ওয়াশিং’ বলে অভিহিত করেছেন। এখন সাধারণ কারণে কর্মী ছাঁটাই হলেও সেটির দায় চাপানো হচ্ছে এআইয়ের ওপর। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী পীযূষ গুপ্তের একটি বক্তব্য বেশ আলোচনায় আসে। তিনি বলেন, ‘এআইয়ের প্রভাবে তিন বছরে ব্যাংকটি থেকে চার হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হবে।’

আরও